প্রবীণদের শারীরিক সমস্যা এবং আমাদের করনীয়

শৈশবের সোনালি সকাল শেষ করে তারুণ্য আর যৌবনের রোদেলা দুপুর পাড়ি দিয়ে, মাঝ বয়সের ব্যস্ত বিকালটাও যখন চলে যায়, তখনই জীবনের গোধূলিবেলা হয়ে আসে বার্ধক্য। এই সময়টাই মানবজীবনের শেষ অধ্যায়। আমাদের সমাজে প্রবীণদের স্বাস্থ্য বা অন্যান্য সমস্যা নিয়ে তেমন কিছু ভাবি না। বয়স্করা বা প্রবীণরা তো আমাদের পরিবারের সৌন্দর্য। তাদের দিকে আমাদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ তারা পরিবারের শ্রদ্ধার পাত্র। তারা অসুস্থ থাকলে গোটা পরিবারেই অশান্তি নেমে আসে। এ জন্য প্রথম থেকেই তাদের স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়। তা ছাড়া মানুষের বয়স যত বাড়ে মানুষ তত একাকী হয়ে পড়ে। এটা বয়স্কদের বা প্রবীণদের জন্য পীড়াদায়ক। সুতরাং যতটা সম্ভব তাদের সঙ্গ দেওয়া উচিত। বয়স্ক বা প্রবীণ লোকের সাধারণত যেসব সমস্যা দেখা দিয়ে থাকে সেগুলো হলো

প্রবীণদের শারীরিক সমস্যা

১। উচ্চ রক্তচাপ

মধ্য বয়সের পর থেকে পুরুষ ও মহিলাদের উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার সম্ভাবনা শুরু হয়। উচ্চ রক্তচাপের অনেক ক্ষেত্রেই কোন লক্ষণ থাকে না। কিন্তু উচ্চ রক্তচাপের কারণে রোগীর হার্ট, কিডনি, রক্তজালিকা ও শরীরের অন্যান্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে। লবণযুক্ত খাবার, মিষ্টি, মাংশ, কোল্ডড্রিঙ্কস প্রভৃতি খাবার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ছোট মাছ, মৌসুমি ফল, শাকসবজি খাওয়া একান্ত প্রয়োজন। ধূমপান ও মদ্যপান ছেড়ে দিতে হবে।

২। ডায়াবেটিস

রক্তে শর্করার পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি থাকলে আমরা তাকে ডায়াবেটিস বলে থাকি। ডায়াবেটিস হলেও অনেক সময় লক্ষণ দেখা যায় না। কিন্তু ডায়াবেটিস হলে শরীর ভেঙে যায়, নার্ভ দুর্বল হয়, চোখ, হার্ট, কিডনি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। পায়ে ঘা হলে, যদি ডায়াবেটিস থাকে, তাহলে আলসার হয়ে যায়। নিয়ন্ত্রিত সুষম আহার, নিয়মিত শরীর চর্চা এই রোগকে নিয়ন্ত্রিত করে।

৩। অপুষ্টি

বয়স্কদের প্রায় সবারই অপুষ্টিজনিত অসুখ-বিসুখ দেখা যায়। যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লক্ষ করা হয় না। শরীরের ইমিউনিটি ও মাংসপেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। বয়স্করা প্রায়ই খেতেও ভুলে যায়। ডিপ্রেশন, নিয়ন্ত্রিত খাদ্য ব্যবস্থা, উপার্জনহীনতা, অসামাজিকতা ইত্যাদি কারণে তাদের নানা ধরনের অসুখ-বিসুখ ও সমস্যা দেখা দেয়। ফলে এ ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে এবং একাকিত্বের সমস্যা দূর করতে হবে। তাহলে অনেকটা স্বাভাবিক অবস্থা বজায় রাখা সম্ভব হবে।
এছাড়াও বয়স্কদের আরও কিছু অসুখ যেমন ডিমেনসিয়া, পারকিনসন, কমনিদ্রা, লাং ইত্যাদির সমস্যার জন্য নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

আমাদের করনীয়

১। প্রথমে মনে রাখতে হবে প্রবীণ বয়োজ্যেষ্ঠরা আমাদের পরিবারেরই অংশ। পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মতোই তার সাথে আচার আচরণ করতে হবে। আমাদের নৈতিক দায়িত্ব হওয়া উচিত সবসময় প্রবীণদের আদর যতœ দিয়ে শিশুদের ন্যায় প্রতিপালন করা। তাদের প্রতি মায়া মমতা, ভালবাসা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। কোন ক্রমেই তাদের মধ্যে যেন এই ধারণা না হয় যে তারা আমাদের জন্য একটি অতিরিক্ত বোঝা।

২। পৃথিবীর অনেক দেশে প্রবীণদের জন্য বৃদ্ধনিবাস বা ওল্ড হোমের ব্যবস্থা আছে। প্রয়োজনে সেরকম ব্যবস্থা আমাদের দেশেও করতে হবে। তাই বলে অযতœ অবহেলায়, দায় এড়ানোর জন্য তাদের যেন এসব বৃদ্ধনিবাসে ঠেলে দেয়া না হয় সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

৩। আমাদের দেশে শুধু সরকারী কর্মচারী চাকরি হতে অবসর নেয়ার পর সামান্য পরিমাণ পেনশন ভাতা পেয়ে থাকেন। প্রবীণ কি শুধু তারাই হবে? সরকারী চাকরির বাইরে যারা অন্য পেশায় আছেন বা ক্ষেতে খামারে কাজ করেন, তারা কি বৃদ্ধ হবেন না? এদের জন্যও এ ধরনের সুযোগ সুবিধা থাকা জরুরী। তা সরকারকে অবশ্যই ভেবে দেখা উচিত।

৪। পেনশন বা বয়স্ক ভাতা হিসেবে যে অর্থ দেয়া হয় তার পরিমাণটাও সম্মানজনক হওয়া উচিত, যাতে তারা খেয়ে পরে চলতে পারেন এবং পরনির্ভরশীল হতে না হয়।

৫। প্রবীণরা যাতে স্বল্পব্যয়ে উন্নত চিকিৎসা লাভ করতে পারেন সেজন্য পর্যাপ্ত হাসপাতালের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারী হাসপাতালে তাদের জন্য আলাদা বিছানা বরাদ্দ থাকা উচিত। বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং ওষুধ তাদের বিনামূল্যে বা অল্প দামে দেয়া উচিত। এছাড়া প্রবীণদের চিকিৎসার জন্য বড় বড় হাসপাতালে বিশেষায়িত বিভাগ খোলা উচিত।

৬। পরিবারের সদস্যদের বা ছেলেমেয়েদের মনে রাখা উচিত, তারা যেন তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

৭। বিভিন্ন সামাজিক, পারিবারিক, ধর্মীয় এমনকি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে যথাসম্ভব প্রবীণদের আমন্ত্রণ জানানো উচিত যাতে তারা নিজেদের অপ্রয়োজনীয় ও অবহেলিত মনে না করেন।

আমাদের প্রবীণদের জীবন যেন সত্যিকার অর্থেই হয় আনন্দের, শান্তিময়, মধুর স্মৃতিময়। তারা যেন নিজেদের অবহেলিত, পরিবারের ও সমাজের বোঝা মনে না করেন।