করোনা ভাইরাসের লক্ষণ ও প্রতিকার

বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে চীনের করোনা ভাইরাস। চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া এ ভাইরাস ইতোমধ্যে আরও ১২টি দেশে ছড়িয়ে গেছে। ‘কভিড-১৯’ হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া করোনা ভাইরাস ডিজিজ-২০১৯ এর অফিশিয়াল নাম। সম্প্রতি কোভিড-১৯ একটি আন্তর্জাতিক ত্রাস হয়ে উঠেছে।

করোনা ভাইরাস কী?

ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের নিচে যে ভাইরাস দেখলে মনে হয় এরা মাথায় মুকুট পরে আছে, সেগুলোই করোনা ভাইরাস। ল্যাটিন ভাষায় একে বলে ‘করোনাম’ (Coronam)। জানা যায়, মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন মোট ৭ ধরনের করোনা ভাইরাস রয়েছে। মার্কিন সংস্থা সেন্টারস ফল ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী সেগুলো হলো

১. 229E (আলফা করোনাভাইরাস)
২. NL63 (আলফা করোনাভাইরাস)
৩. OC43 (আলফা করোনাভাইরাস)
৪. HKU1 (বিটা করোনাভাইরাস)
৫. MERS-CoV (বিটা করোনা ভাইরাস, যার কারণে Middle East Respiratory Syndrome or MERS হয়): ২০১২ সালে সৌদি আরবে প্রথমবার এই ভাইরাসের নাম শিরোনামে উঠে এসেছিল।
৬. SARS-CoV (বিটা করোনাভাইরাস, যার কারণে Severe Acute Respiratory Syndrome or SARS হয়): ২০০৩ সালে এশিয়ায় এই ভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করেছিল। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়েছিল এই প্রাণঘাতী ভাইরাস। বহু মানুষ মারা যান। তবে ২০০৪ সালের পর এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আর কোনো রিপোর্ট সামনে আসেনি।
৭. SARS-CoV-2 (নভেল করোনাভাইরাস, যার কারণে Corona Virus Disease 2019 হয়): এই ভাইরাসই করোনাভাইরাস নামে পরিচিত। করোনার CO, ভাইরাসের VI, ডিজিজের D ও প্রথম শনাক্তের সাল 19 নিয়ে হয়েছে COVID-19। এটি প্রথম চীনের উহানে আবির্ভূত হয়।

মানুষ সাধারণত করোনাভাইরাস 229E, NL63, OC43, HKU1 ভাইরাসের সংক্রমিত হতে পারে, যারা মানুষের দেহে সাধারণ সর্দি-কাশি ব্যতীত অন্য কোনো উপসর্গ বা রোগ সৃষ্টি করত না। কিন্তু কখনো করোনা ভাইরাসগুলো বিভিন্ন প্রাণীকে সংক্রমিত ও মিউট্যান্ট করে এ পর্যন্ত তিনটি নতুন ধরনের করোনা ভাইরাসের উদ্ভব হয়েছে (সার্স, মার্স ও উহান করোনাভাইরাস) যেগুলো মানবসম্প্রদায়ে ব্যাপক অঞ্চলজুড়ে প্রাণঘাতী আকার ধারণ করার ঝুঁকি বহন করে।

ছড়ানো/ বিস্তারের ধরন:

১। সংস্পর্শের মাধ্যমে
করোনাভাইরাসও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংস্পর্শের মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তিতে ছড়াতে পারে।
২। হাঁচি, কাশি, লালা বা থুতু
বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের সময় মুখের হাঁচি, কাশি, লালা বা থুতু থেকে সরাসরি ভাইরাসটি এক       ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তিতে সংক্রমিত হতে পারে।
৩। ভাইরাসযুক্ত হাত
অন্যদিকে জনসমাগমস্থলে কোনো আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি-কাশি দিলে বা ভাইরাসযুক্ত হাত দিয়ে ধরলে কাছাকাছি পৃষ্ঠতলে              যেমন টেবিলের তল, দরজার হাতল, বাতির সুইচ, পানির কল, খাটের খুঁটিতে বা সেলফোনে ভাইরাস লেগে থাকতে পারে। সেখান থেকে পরোক্ষভাবে অন্যদের মধ্যে সেটি ছড়াতে পারে।
৪। আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার সময়
এ ছাড়া করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার সময়—যেমন ফুসফুস বা শ্বাসনালির চিকিৎসার সময়ে দেহ থেকে নিঃসৃত ভাইরাসের কণাগুলো বাতাসে ভেসে একাধিক চিকিৎসাকর্মীকে সংক্রমিত করতে পারে এবং সাবধানতা অবলম্বন না করলে হাসপাতালের সবার মধ্যে এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ইনকিউবেশন পিরিয়ড:

ভাইরাসটির সংক্রমণ ও লক্ষণ প্রকাশের অন্তর্বর্তী কাল (ইনকিউবেশন পিরিয়ড) এখনো নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও সংক্রমণের মোটামুটি ১-১৪ দিনের মধ্যেই রোগের উপসর্গ দেখা যাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

লক্ষণ ও উপসর্গ:

১। এই ভাইরাসে আক্রান্তদের আপাতভাবে সুস্থ মনে হতে পারে।
২। ফ্লু-এর মতো উপসর্গ দেখা যেতে পারে। এসব উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি ইত্যাদি।
৩। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় ঊর্ধ্ব-শ্বাসতন্ত্রের কিছু লক্ষণ—যেমন হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া, গলাব্যথা ইত্যাদি।
৪। মাথা ব্যথা, মাংসপেশিতে বা মাংসপেশির সংযোগে ব্যথা ইত্যাদি।
৫। গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টাইনাল উপসর্গ যেমন বমি-বমিভাব, বমি, ডায়রিয়া ইত্যাদিও হতে পারে।
রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি:
৬। RT-PCR পরীক্ষা। রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ-পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন পদ্ধতি ব্যবহার করে রোগ নির্ণয়ের জন্য ভাইরাসের জিনগত উপাদান শনাক্ত করা হয়।
৭। রোগীদের রক্ত পরীক্ষা করে দেখা গেছে এই ভাইরাসের কারণে তাদের শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা হ্রাস পায় (Leukopenia +Lymphopenia)।
৮। ইমিউনিঅ্যাসে-সেরোলজি পরীক্ষায় এলিসা অ্যান্টিবডি পরীক্ষণ-সামগ্রী ব্যবহার করা হয়, যেন হোস্ট দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যে অ্যান্টিবডি তৈরি করে, তা শনাক্ত করে রোগ নির্ণয় করা যায়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে IgM ও IgG অ্যান্টিবডির উপস্থিতি জানা যাবে ও ১৫ মিনিটের মধ্যে ফলাফল পাওয়া যাবে।
৯। সিটি স্ক্যান-বুকের সিটি স্ক্যান ফুসফুসের প্যাথোলজি শনাক্ত ও একে শ্রেণিবিন্যস্ত করতে সহায়তা করে এবং কোভিড-১৯ সংক্রমণের কিছু দিক চিহ্নিত করতে পারে। ফুসফুসের দু পাশের কয়েকটি অংশে কাচের মতো স্বচ্ছ সাদা অংশ দেখা যায়, যা চারদিকে (peripheral) অথবা
পেছনে বিন্যস্ত থাকে।

কোভিড-১৯ প্রতিরোধে করণীয়:

১। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম মানতে হবে। করোনাভাইরাস কোনো লক্ষণ-উপসর্গ ছাড়াই দু সপ্তাহের বেশি সময় ধরে যেকোনো ব্যক্তির দেহে তার অজান্তেই বিদ্যমান থাকতে পারে। করোনাভাইরাস বহনকারী ব্যক্তি যদি কোনো কারণে হাঁচি বা কাশি দেন, তাহলে তার আশপাশের বাতাসে ৩ থেকে ৬ ফুট দূরত্বের মধ্যে করোনাভাইরাসবাহী জলীয় কণা (ড্রপলেট) বাতাসে ভাসতে শুরু করে এবং ওই পরিধির মধ্যে থাকা যেকোনো ব্যক্তির দেহে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ভাইরাসটি প্রবেশ করতে পারে। এ কারণে জনসমাগম বেশি—এমন এলাকা যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে, যাতে বাতাসে ভাসমান সম্ভাব্য করোনাভাইরাস কণা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে দেহে প্রবেশ না করতে পারে।
২। কারও সঙ্গে করমর্দন করা (হাত মেলানো) বা কোলাকুলি করা বা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এলে এটি ছড়াতে পারে। তাই এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে।
৩। নাক, মুখ ও চোখ হাত দিয়ে স্পর্শ না করা। কারণ, করোনাভাইরাস কেবলমাত্র নাক, মুখ ও চোখের উন্মুক্ত শ্লেষ্মা ঝিল্লি দিয়ে দেহে প্রবেশ করতে পারে।
৪। মানুষ হাত দিয়ে স্পর্শ করে, যেমন দরজার হাতল, কম্পিউটারের কিবোর্ড ও মনিটরের পর্দা, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন বা অন্য কোনো বহুল ব্যবহৃত আসবাব ইত্যাদি নিয়মিতভাবে কিছু সময় পরপর জীবাণু নিরোধক স্প্রে বা দ্রবণ দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।
৫। নিয়মিত কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ধরে সাবানের ফেনা তুলে ভালো করে হাত ধোয়ার অভ্যাস তৈরি করা।
৬। পরিবেশ পরিষ্কার করে করোনাভাইরাস মুক্তকরণ—যেমন রাস্তায় ও যত্রতত্র থুতু ফেলা যাবে না। কারণ, থুতু থেকে ভাইরাস ছড়াতে পারে।
৭। পরিচিত কারও করোনাভাইরাসের লক্ষণ-উপসর্গ দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা জরুরি ফোনে যোগাযোগ করতে হবে, যাতে তাকে দ্রুত পরীক্ষা করা যায় এবং প্রয়োজনে সঙ্গনিরোধ (কোয়ারেন্টিন) করে রাখা যায়।
৮। হাসপাতালে ও অন্য কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীদের অবশ্যই বিশেষ চিকিৎসা মুখোশ ও হাতমোজা পরিধান করতে হবে, যাতে ভাইরাস এক রোগী থেকে আরেক রোগীতে না ছড়ায় এবং চিকিৎসাকর্মী নিজে সংক্রমিত না হন।