লজ্জা ও সামাজিক ভয় (সোশ্যাল ফোবিয়া)

ফোবিয়া একধরনের ভয়। আমাদের অনেকের মাকড়সা দেখলে ভয় হয় বা উঁচু জায়গায় দাঁড়ালে মাথা ঘুরে যায়।তবে সাধারণত এতে আমাদের দৈনন্দিন কাজের ব্যাঘাত হয় না। ভয় তখনি ফোবিয়া হয়ে দাঁড়ায় যখন এর ফলে আমাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়। একশো জনের মধ্যে পাঁচ জনের সোশ্যাল ফোবিয়া থাকে। পুরুষের তুলনায় মহিলাদের ক্ষেত্রে এটি ২/৩ গুণ বেশি দেখা যায়।

আপনার সোশ্যাল ফোবিয়া থাকলে আপনি অচেনা লোকের সামনে খুব অস্বস্তিবোধ করবেন। আপনার মনে হবেঃ

  • সবাই আপনাকে অপছন্দ করছে
  • আপনি এখনি কী করতে কী করে বসবেন

এই অনুভূতি এতই কষ্টকর হতে পারে যে আপনি হয়ত লোকের সঙ্গে মেলামেশাই করতে পারবেন না। সব সামাজিক অনুষ্ঠান আপনি এড়িয়ে যাবেন।

প্রকারভেদ

প্রধানতঃ দুধরনের সোশ্যাল ফোবিয়া দেখা যায়ঃ

১। সাধারণ (বা জেনেরালাইজেড) এবং

২। স্পেসিফিক

১। জেনেরাল সোশ্যাল ফোবিয়াঃ

এতে আপনিঃ

  • মনে করেন যে লোকে আপনার দিকে তাকিয়ে দেখছে
  • মনে করেন যে তাঁরা আপনি কী করছেন না করছেন তার উপর নজর রাখছে
  • অপরিচিত লোকের সঙ্গে আলাপ করতে চাইছেন না
  • দোকানে বা রেস্তোরাঁতে যেতে চাইছেন না
  • লোকের সামনে খেতে অসুবিধা হচ্ছে
  • স্বল্প পোশাকে বাইরে বেরোতে চাইছেন না (যথা সমুদ্রের ধারে)
  • প্রয়োজন সত্ত্বেও স্পষ্ট করে নিজের মনোভাব জানাতে দ্বিধাবোধ করছেন

স্পেসিফিক সোশ্যাল ফোবিয়াঃ

এটি দেখা যায় কিছু লোকের মধ্যে যাঁদের কাজের ধরনই এমন যে তাঁদের মধ্যমণি হতে হয়। নায়ক, গায়ক, শিক্ষক বা ইউনিয়নের নেতা প্রমুখরা এই দলের অন্তর্ভুক্ত। স্পেসিফিক সোশ্যাল ফোবিয়া থাকলে লোকের সঙ্গে মেলামেশা করতে কোনো অসুবিধা হয় না। কিন্তু সবার সামনে যখন দাঁড়িয়ে কথা বলতে বা গান গাইতে গেলে টেনসন হয় এবং কেউ কেউ তোতলাতে থাকেন। এমনকী যাঁরা অভিজ্ঞ, এবং এই কাজ প্রায়ই করে থাকেন তাঁদের হঠাৎ এই উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এমনও হতে পারে যে লোকের সামনে একটাও কথা বলা যায় না, একটা প্রশ্ন অবধি করা যায় না।

উপসর্গ সমূহ

দুধরনের ফোবিয়াতেই স্ট্রেসের উপসর্গ দেখা দেয়। আপনি দেখবেন যে আপনিঃ

  • খুব চিন্তা করছেন যে লোকের সামনে অস্বাভাবিক কোনো আচরণ না করে ফেলি
  • যেখানে যেতে আপনার মন চাইছে না, সে বিষয়ে সবসময় ভেবে যাচ্ছেন
  • মনে মনে ভাবছেন কবে কখন কোন পরিস্থিতিতে আপনি লজ্জায় পড়েছিলেন
  • আপনি যা করতে চান বা বলতে চান তা পারছেন না
  • একটা ঘটনার পর বার বার ভাবছেন ‘কী করলাম, কী করলাম’
  • আপনি হয়ত বার বার পুংখানুপুংক্ষ ভাবে নিজের মনে ভাববেন কী করা উচিৎ ছিল বা বলা উচিৎ ছিল।

সোশ্যাল ফোবিয়াতেই কিছু শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়

  • মুখ শুকিয়ে যাওয়া
  • অতিরিক্ত ঘামা
  • বুক ধড়ফড় করা
  • বারবার প্রসাব বা পায়খানা পাওয়া
  • হাত বা পা ঝিমঝিম করা বা অসাড় হয়ে যাওয়া (এটি হয় কারণ আপনি খুব দ্রুত নিশ্বাস নিচ্ছেন)

অন্যেরা হয়ত আপনাকে দেখে বুঝতে পারবেন যে আপনি অস্বস্তিতে পড়েছেন। আপনি হয়ত লাল হয়ে যাচ্ছেন, তোতলাচ্ছেন বা আপনার হাত পা কাঁপছে। এই উপসর্গগুলি আপনার ভীষণ ভয়ানক মনে হতে পারে এবং আপনার টেনসন আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।

এরপর এটি বাড়তে থাকে চক্রাকারে। আপনার চোখেমুখে ফুটে ওঠে এর অভিব্যাক্তি। আপনার টেনসনই আপনার সবচেয়ে বড় শত্রু।

সোশ্যাল ফোবিয়া থেকে যে সব ফোবিয়া দেখা দেয়

বিষাদরোগ

সোশ্যাল ফোবিয়া থেকে বিষন্নতার জন্ম হতে পারে। শেই বিষাদরোগ এত বেশি তীব্র হতে পারে যে তার জন্য আলাদা চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

আগারোফোবিয়া

আপনি যদি সবসময় যেখানে মানুষ আছে সেই জায়গায় না যান তবে এই জায়গাগুলির প্রতি আপনার ভীতি জন্মাতে পারে। এমনকী আপনি নিজের বাড়ী ছেড়ে বেরোতেও ভয় পেতে পারেন—তাকে বলে আগারোফোবিয়া।

মদ ও অন্য নেশা

আপনি হয়ত আপনার মনের কষ্ট লাঘব করতে মদ, ড্রাগ বা ঘুমের ঔষধ ব্যবহার করতে পারেন। এর ফলে আপনি মাদকাসক্ত হয়ে যেতে পারেন।

আপনার করনীয় কি

  • আপনি স্বভাবতই লাজুক হলে লোকাল কোনো আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর কোর্স করতে পারেন।
  • রিল্যাক্স করতে শিখুন। বই, টেপ, সিডি, ডিভিডি সব পাওয়া যায় রিল্যাক্সসেসান পদ্ধতি শেখানোর। আপনি দুশিন্তা শুরু হলেই রিল্যাক্স করলে বাড়াবাড়ি আটকে দিতে পারবেন।
  • আপনার দুশ্চিন্তাগুলি লিখে রাখুন। আপনার সম্পর্কে যে ছবি ফুটে উঠছে, লিখে রাখলে তার পরিবর্তন করা অপেক্ষাকৃত সহজ।
  • আপনি নিজে মনে মনে কী ভাবছেন সেকথা চিন্তা না করে লোকে কী বলছে তা শোনার চেষ্টা করুন।
  • যে সাবধানতা আপনি অবলম্বন করেন, সেটা বন্ধ করুন। যেটি সহজতম সেটি দিয়েই শুরু করুন।
  • কোনো ভয়জনক পরিস্থিতি হলে তাকে ছোটো ছোটো ধাপে ভেঙ্গে দেখুন। প্রথম ধাপটি অভ্যাস করুন। অভ্যস্ত হতে সময় লাগতে পারে। অভ্যস্ত হয়ে গেলে পরের ধাপে এগোন। তারপর তার পরের ধাপে। এমনি করে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলুন।

সাইকোলজিকাল চিকিৎসা

গ্রেডেড সেলফ এক্সপোজার

আমরা জানি যে যে কোনো পরিস্থিতে শুরুর দিকে বেশি ভয় করে, খানিক বাদে সেই ভয় ভাঙ্গতে শুরু করে। এইজন্য ধাপে ধাপে এগোলে ভয় কাটানো যায়।

আপনি কোন কোন পরিস্থিতিতে ভয় পান, তার একটা তালিকা তৈরি করুন। তারপর এদের পরপর সাজিয়ে নিন। সবার আগে রাখুন যে পরিস্থিতিতে আপনি সবচেয়ে কম ভয় পান, এবং সবার শেষে রাখুন যে পরিস্থিতি আপনার কাছে সবচেয়ে ভয়প্রদ। সবচেয়ে সহজ পদক্ষেপটি নিন আপনার থেরাপিষ্টের সাহায্যে। যতক্ষণ না আপনি স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন ততক্ষণ পরের ধাপে যাবেন না। স্বচ্ছন্দ বোধ করলএ পরের ধাপে যান। এক এক করে এগোলে সবচেয়ে ভয়ের পরিস্থিতিও আপনি সামলাতে পারবেন।

কগ্নিটিভ বিহেভিয়র থেরাপি (সিবিটি)

আপনার নিজের সম্বন্ধে, চারপাশের মানুষজন সম্বন্ধে এবং পৃথিবী সম্বন্ধে যা ধারণা তার সঙ্গে সোশ্যাল ফোবিয়ার গভীর সংযোগ আছে। আমাদের চিন্তাপদ্ধতি আমাদের দুশ্চিন্তাকে ইন্ধন যোগায়। এই চিকিৎসাতে আপনার নিজের সম্পর্কে এবং অন্যদের সম্পর্কে ধারণা পরিবর্তন হবে।